ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন: প্রকৌশল, সাহিত্য ও সুরের বহুমাত্রিক এক আলোকবর্তিকা
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু গান থাকে, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্মের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে
নেয়। আশির দশকের আবেগমাখা দিনগুলোতে “তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে” গানটি যেমন তরুণ
হৃদয়ে ভালোবাসা, স্বপ্ন ও নস্টালজিয়ার ঢেউ তুলেছিল, তেমনি আজও তার সুর আর কথার ভেতর বেঁচে
আছে এক অমলিন অনুভব। কুমার বিশ্বজিৎ-এর কণ্ঠে কিংবা সোলস ব্যান্ডের নকীব খানের সুর-
আয়োজনে এই গান হয়ে উঠেছিল বাংলা আধুনিক গানের এক অনন্য সম্পদ। এই সৃষ্টির নেপথ্যে যে
নামটি নিভৃতে দীপ্তি ছড়ায়, তিনি ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন—একাধারে প্রকৌশলী, গীতিকার, লেখক,
সুরকার, রেডিও উপস্থাপক ও সমাজমনস্ক চিন্তক।
চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে আসা ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের জীবন ও কর্ম এক বহুমাত্রিক
সাফল্যের গল্প। তাঁর পরিচয় কোনো একক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৌশল পেশার কঠিন বাস্তবতা
ও বিশ্লেষণধর্মী জগতে যেমন তিনি সুনাম অর্জন করেছেন, তেমনি শব্দ, সুর ও সাহিত্যচর্চার
কোমল ভুবনেও রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর।
২০২৬ সালের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্বাধীনতা আন্দোলন,
মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, সমাজসেবা, স্বাস্থ্য, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক
ভাষা ও সাহিত্যসহ নানা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে
“স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা” প্রদান করে। সাহিত্য বিভাগে গীতিকবিতায় বিশেষ অবদানের
স্বীকৃতিস্বরূপ এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করেন সিডনিপ্রবাসী প্রকৌশলী ড. আব্দুল্লাহ
আল মামুন। চট্টগ্রাম বইমেলার শেষদিনে এম. এ. আজিজ স্টেডিয়াম জিমনেশিয়াম মাঠের মঞ্চে এই
সম্মাননা প্রদান তাঁর সৃজনশীল জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
ড. মামুনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রকৌশল বিদ্যার দৃঢ় ভিত্তির ওপর। ১৯৮৩ সালে
চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি উচ্চশিক্ষার
জন্য পাড়ি জমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। Asian Institute of Technology-এ উচ্চশিক্ষা এবং
পরবর্তীতে Western Sydney University থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে পিএইচডি অর্জন তাঁর
পেশাগত দক্ষতাকে বৈশ্বিক মাত্রা দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করে তিনি পানি সম্পদ পরিকল্পনা, টেকসই
উন্নয়ন, ড্রেনেজ পরিকল্পনা, বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা, হাইড্রোলিক মডেলিং এবং বন্যা ঝুঁকি
বিশ্লেষণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২২ FIFA World Cup-কে কেন্দ্র করে কাতারের জাতীয়
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও তাঁর পেশাগত চিন্তা ও পরিকল্পনার ছাপ রয়েছে। বর্তমানে তিনি
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে একজন সিনিয়র প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পেশাগত উৎকর্ষের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলস
রাজ্যের সম্মানজনক পাবলিক সেক্টর অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চার
ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। নতুন প্রজন্মের কাছে প্রকৌশলচিন্তা, পরিবেশ সচেতনতা ও
বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন ভাবনা পৌঁছে দিতে তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন।
ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সৃজনশীল পরিচয়ও সমান উজ্জ্বল। বাংলা গানের জগতে তাঁর লেখা বহু
গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে জীবন্ত। সোলস ব্যান্ডের জন্য তাঁর লেখা “এই মুখরিত জীবনের চলার
পথে”, “ভুলে গেছ তুমি”, “ওরে ছোট্টবেলার সাথী”সহ একাধিক গান বাংলা ব্যান্ড ও আধুনিক গানের
ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর অ্যালবাম তোমার জন্য সংগীতপ্রেমীদের কাছে
বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।
লেখালেখিতেও তিনি রেখেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়। খুঁজে পেয়েছি প্রিয়তমা, শেষ কথা, কাতারে বহতা
সময়, ভাবনার দিগন্তে, কাতারে জীবন—তাঁর বইগুলোতে কবিতা, ভ্রমণ, জীবনবোধ, প্রবাসজীবন ও
অভিজ্ঞতার নানা রঙ একত্রে ফুটে উঠেছে। তাঁর লেখায় যেমন ব্যক্তিগত অনুভব আছে, তেমনি আছে
দেশ, সময়, মানুষ ও সমাজ নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ।
অস্ট্রেলিয়ার বহুজাতিক বেতার সংস্থা এসবিএস-এর বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন রেডিও উপস্থাপক
হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা, বাংলা ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং
সংস্কৃতির সঙ্গে প্রজন্মের সংযোগ স্থাপনে তাঁর এই ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রবাসে বসবাস করলেও ড. মামুনের চিন্তা ও কর্মে বাংলাদেশ সবসময় অগ্রগণ্য। ঢাকা ও
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যাকে ঘিরে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন এবং সমাধানের পথ
খুঁজেছেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে কার্যকর দুটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সহযোগিতা করেছেন, যা
বাস্তবায়িত হলে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার টেকসই সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে পারে।
ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে যুক্তির জগৎ ও অনুভূতির
জগৎকে ধারণ করেছেন। তাঁর হাতে প্রকৌশল হয়ে ওঠে মানবকল্যাণের পরিকল্পনা, আর তাঁর কলমে
শব্দ হয়ে ওঠে সুর, স্মৃতি ও ভালোবাসার ভাষা। গীতিকবিতায় অবদানের জন্য স্বাধীনতা স্মারক
সম্মাননা তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের এক মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হলেও, তাঁর প্রকৃত অর্জন রয়ে গেছে
মানুষের হৃদয়ে—গানে, কথায়, কর্মে এবং দেশপ্রেমের গভীর অনুরণনে।
